Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
জাতীয়

মধ্যরাতে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা, বড় কারণ ব্যাটারিচালিত রিকশা

মধ্যরাতে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা, বড় কারণ ব্যাটারিচালিত রিকশা

দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদার প্রচলিত চিত্রও বদলে যাচ্ছে। দিনের তুলনায় মধ্যরাতে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকায় বাড়ছে বিদ্যুৎ সরবরাহের চাপ। অন্যদিকে গ্যাসের সংকট ও এলপিজির উচ্চমূল্যের কারণে বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় দিনের বেলায়ও বাড়তি বিদ্যুতের প্রয়োজন হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে এক প্রতিবেদনে যুগান্তর জানায়, দেশে বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ধারণা করছেন। এসব রিকশার ব্যাটারি চার্জ দিতে মধ্যরাতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে চাহিদা সামাল দিতে সরকারকে উচ্চমূল্যের জ্বালানি তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখতে হচ্ছে।

মধ্যরাতে বিদ্যুতের চাহিদা কেন বেশি

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান রেজাউল করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত রিকশার বিদ্যুৎ ব্যবহার এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রচলিত হিসাবে দিনের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়কে ‘পিক’ এবং রাতের কম চাহিদার সময়কে ‘অফ-পিক’ বলা হলেও বাস্তবে এই ব্যবধান কমে আসছে। মধ্যরাতে বিদ্যুতের চাহিদা যে পরিমাণ কম থাকার কথা, তা আর দেখা যাচ্ছে না।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাত ১টার দিকে বিদ্যুতের চাহিদা দিনের সর্বোচ্চ চাহিদাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রতি ইউনিট ২৫ টাকার বেশি ব্যয়ে উৎপাদিত তেলচালিত বিদ্যুৎও ব্যবহার করতে হচ্ছে। পিডিবি, ডেসকো ও ডিপিডিসির হিসাব অনুযায়ী, শুধু ঢাকায় মধ্যরাতে রিকশার ব্যাটারি চার্জ দিতেই প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়।

রিকশার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে অনিশ্চয়তা

দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশার সঠিক সংখ্যা নির্ধারণের কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব নেই। তবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামানের ধারণা, দেশে বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫ লাখ রিকশা শুধু ঢাকায় চলাচল করে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সেবাস্তিয়ান গ্রোহের গবেষণাতেও দেশে প্রায় ৬০ লাখ রিকশা থাকার তথ্য উঠে এসেছে। তাঁর মতে, প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার নতুন রিকশা সড়কে নামছে। অন্যদিকে দেশীয় ব্যাটারি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স ব্যাটারিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ইমরান করিমের ভাষ্য, দেশে ৫০ লাখের বেশি রিকশা চালু রয়েছে এবং প্রতি মাসে অন্তত পাঁচ লাখ নতুন ব্যাটারি বিক্রি হচ্ছে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবেও অনেকে রিকশা চালানোকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে পরিকল্পিত নীতিমালা ও সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানের অভাবে এই খাতের প্রকৃত আকার এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে।

বৈদ্যুতিক চুলায়ও বাড়ছে চাহিদা

ব্যাটারিচালিত রিকশার পাশাপাশি বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বৃদ্ধি বিদ্যুৎ খাতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। গ্যাসের সংকট এবং এলপিজির উচ্চমূল্যের কারণে অনেক পরিবার ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড চুলার দিকে ঝুঁকছে।

দেশীয় কোম্পানিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহৃত হচ্ছে। ওয়ালটনের হোম অ্যাপ্লায়েন্স বিভাগের ম্যানেজার মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগে মাসে গড়ে ১০ হাজার বৈদ্যুতিক চুলা বিক্রি হলেও গত আগস্টে বিক্রির পরিমাণ চার লাখে পৌঁছেছিল।

একটি বৈদ্যুতিক চুলায় দৈনিক দুই থেকে তিন ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হতে পারে। পিডিবির সদস্য জহুরুল ইসলামের মতে, এসব চুলার কারণে দিনে নতুন করে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি হয়েছে।

লিথিয়াম ব্যাটারিতে সাশ্রয়ের সম্ভাবনা

বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদার মধ্যেও আধুনিক ব্যাটারি প্রযুক্তিতে সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশায় লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। এর পরিবর্তে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি চালু করা গেলে বিদ্যুতের ব্যবহার ও পরিচালন ব্যয় কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সবুজ জ্বালানি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান সোলশেয়ারের পরিচালক (বিজনেস) ইসা আবরার আহমেদের দাবি, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ব্যবহার বাড়ানো গেলে প্রতিদিন ১৩ কোটি ২০ লাখ টাকার বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পে দেখা গেছে, দিনভর রিকশা চালানোর পরও লিথিয়াম ব্যাটারিতে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ অবশিষ্ট থাকতে পারে। উপযুক্ত প্রযুক্তি ও সংযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব। রাজধানীর উত্তরখানের হোসনে আরা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি গ্যারেজ নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের ব্যাটারি থেকে ১ হাজার ৭২ ইউনিট বিদ্যুৎ ডেসকোর লাইনে সরবরাহ করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

গ্যারেজটির মালিক মোহাম্মদ দাউদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি রিকশার লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি চার্জ দিতে দৈনিক ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা খরচ হয়। সেখানে লিথিয়াম ব্যাটারির ক্ষেত্রে খরচ ৮০ থেকে ৮৫ টাকা। তাঁর দাবি, লিথিয়াম ব্যাটারি প্রায় তিন বছর ব্যবহার করা যায়, যেখানে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির স্থায়িত্ব এক বছরেরও কম।

গ্যারেজটিতে পরীক্ষামূলকভাবে ১৮ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্যানেলও স্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এই প্যানেল থেকে দিনে তিনটি রিকশার লিথিয়াম ব্যাটারি চার্জ দেওয়া সম্ভব।

রিকশাকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্পদে রূপান্তরের ভাবনা

সোলশেয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সেবাস্তিয়ান গ্রোহের মতে, দেশের বিপুলসংখ্যক বৈদ্যুতিক রিকশাকে লিথিয়াম ব্যাটারির আওতায় এনে একটি সমন্বিত ‘ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্ট’ গড়ে তোলা সম্ভব। এ ব্যবস্থায় ব্যাটারিগুলো শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে না, প্রয়োজন অনুযায়ী জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহও করতে পারবে। পাশাপাশি দেশে ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।

তাঁর হিসাব অনুযায়ী, বড় পরিসরে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে বছরে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও বৈদ্যুতিক চুলারের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, রিকশার সঠিক পরিসংখ্যান নির্ধারণ, ব্যাটারি প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এবং গ্রিডে বিদ্যুৎ ফেরত দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এই চ্যালেঞ্জকে সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া সম্ভব।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies