দেশে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত বিকাশ ঘটেনি। দুর্বল অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, অপর্যাপ্ত বাজেট, আন্তর্জাতিক প্রচারের ঘাটতি এবং নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় সম্ভাবনাময় এ খাত এখনো প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।
বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে আমার দেশ-এর সিনিয়র রিপোর্টার কবিতার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘ডিজিটাল এজেন্ডা এবং ট্যুরিজম পুনর্গঠনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব পর্যটন দিবস।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শন ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য পর্যটন খাতের বড় সম্পদ। সুন্দরবন, কক্সবাজার, সিলেটের চা-বাগান, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সুনামগঞ্জের হাওর, কুয়াকাটা, সেন্টমার্টিন, সাজেক ও বান্দরবানসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে পর্যটনের ব্যাপক সুযোগ। তবে এসব সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে হলে পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, বিনিয়োগ এবং পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
পর্যটন খাতকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে দেশের ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন কেন্দ্র চিহ্নিত করে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে। জাতীয় সংসদে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এ তথ্য জানিয়েছেন। পাশাপাশি জাতীয় পর্যটন নীতিমালা-২০২৬, ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট এবং কমিউনিটি ও সাংস্কৃতিক পর্যটনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পর্যটন বোর্ডের প্রধান নির্বাহী ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী জানিয়েছেন, পর্যটনের একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলছে এবং চলতি বছরেই তা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। ১৯ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ৩ শতাংশ থেকে ৮ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে তিনি জানান।
তবে পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে পরিকল্পনার অভাবের চেয়ে বড় সমস্যা বাস্তবায়নে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইপিই গ্লোবাল একটি দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছিল। ওই পরিকল্পনাতেও ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন স্থান মূল্যায়ন করা হয়। এতে ৫১টি পর্যটন ক্লাস্টার, ১৪টি থিম এবং দুই শতাধিক প্রকল্পের কথা বলা হয়েছিল। সম্ভাব্য বিনিয়োগ ধরা হয়েছিল প্রায় ১০০ কোটি ডলার।
পরিকল্পনাটির লক্ষ্য ছিল ২০৪১ সালের মধ্যে বিদেশি পর্যটক বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পর্যটনকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত করা। কিন্তু ছয় বছর পরও পরিকল্পনার বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া, নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের পর্যটন খাতের সঙ্গে একাধিক মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকায় সমন্বয়ের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিমানবন্দর, সড়ক, রেল, নৌপথ, গণপরিবহন, ডিজিটাল তথ্যসেবা এবং পর্যটন নির্দেশনাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনা জরুরি।
নিরাপত্তার বিষয়টিও পর্যটন বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা, সড়ক নিরাপত্তা, জরুরি চিকিৎসা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং নারী ও বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি প্রতারণা, ছিনতাই ও চুরির মতো ঘটনা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনার যথেষ্ট প্রচার হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরে কার্যকর আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং প্রয়োজন।
পর্যটন খাতের অর্থনৈতিক সাফল্য শুধু নতুন রিসোর্ট বা পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, স্থানীয় মানুষের আয় বৃদ্ধি, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধির মতো সূচকেও এর অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশে পর্যটন নিয়ে নীতিমালা প্রণয়নের ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯৯২ সালে জাতীয় পর্যটন নীতি প্রণয়ন করা হয় এবং ২০১০ সালে তা হালনাগাদ করা হয়। এসব নীতিতে কক্সবাজার, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকা উন্নয়নের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
বিদেশি পর্যটক আগমনেও ওঠানামা রয়েছে। পর্যটন বোর্ড ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক এসেছিলেন ১ লাখ ৮১ হাজার ৫১৮ জন। ২০২১ সালে এ সংখ্যা কমে ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৮৬ জনে দাঁড়ায়। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৫ লাখ ২৯ হাজার ২৬৮, ২০২৩ সালে ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৪৫১ এবং ২০২৪ সালে প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজারে পৌঁছায়। ২০২৫ সালে আবার কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫ জনে। দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩ কোটি দেশীয় পর্যটক বিভিন্ন গন্তব্যে ভ্রমণ করেন।
প্রতিবেদনে অ্যাভিয়েশন ও পর্যটন বিশেষজ্ঞ ওয়াহিদুল আলমের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি পর্যটন খাতের উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগের ঘাটতি, দুর্বল নীতিমালা বাস্তবায়ন, কম বাজেট, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং এবং ভিসা জটিলতার কথা উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে দেশের হোটেল-মোটেল ও পর্যটন ব্যয় প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বেশি হওয়ায় বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে সমস্যা হচ্ছে বলেও তিনি মত দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নতুন পরিকল্পনার পাশাপাশি বিদ্যমান পরিকল্পনার বাস্তবায়ন জরুরি। নিরাপদ ও সহজ যোগাযোগব্যবস্থা, আধুনিক অবকাঠামো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, আন্তর্জাতিক প্রচার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এ খাত দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।




