জামালপুর ডেস্ক:
চলতি অর্থবছরের বাজেটে কৃষিপণ্য, মসলা, সোলার, কম্পিউটার ও বিভিন্ন ইলেকট্রিক পণ্যসহ ৬৩টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক-কর কমানো হলেও এর সুফল মিলছে না খুচরা বাজারে। বেশিরভাগ পণ্যের দাম আগের অবস্থাতেই রয়েছে। কোনো কোনো পণ্যের দাম বরং বেড়েছে। ফলে করছাড়ের সুবিধা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, দেশে জ্বালানি সংকট, বন্যা ও অতিবৃষ্টিসহ বিভিন্ন কারণের কথা বলছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কর কমানো বা অব্যাহতি দেওয়াই যথেষ্ট নয়। এর সুফল ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও বাজার তদারকি করা জরুরি।
নতুন সরকারের প্রথম বাজেট চলতি বছরের ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়। এতে ৬৩টি নিত্যপণ্যের ওপর শুল্ক-কর কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। আমদানি করা বিভিন্ন মসলার ওপর শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়। পাশাপাশি চাল, আটা, গম, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি কৃষিজাত ও ভোগ্যপণ্যের আমদানি ও সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়।
তবে করছাড়ের পরও নিত্যপণ্যের বাজারে এর প্রত্যাশিত প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ১১ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ। বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ৬ থেকে ৯ শতাংশ। বিভিন্ন মসলার দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৬ শতাংশ, চিনি ২ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং সাধারণ মানের খেজুরের দাম বেড়েছে ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
গত ২ সেপ্টেম্বর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়ানোর ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব অনুমোদন করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ফলে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৯ টাকা থেকে বেড়ে ২০৪ টাকা হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি থেকে শুরু করে পরিবহন পর্যন্ত বিভিন্ন খরচ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। এসব কারণে পণ্যের দাম কমানো সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে চালের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, বিআর-২৮ চাল ৬০ টাকা, মিনিকেট ৭২ টাকা, নাজিরশাইল ৮৮ টাকা এবং কাটারি নাজির ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্র্যান্ড ও মানভেদে মিনিকেট চালের দামে পার্থক্য রয়েছে।
পাইকারি ব্যবসায়ীরাও চালের দাম বাড়ার কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, গত এক সপ্তাহে মিনিকেট চালের ৫০ কেজির বস্তায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। কয়েক ধাপে হাতবদল ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে চালের দাম কখনো বাড়ছে, আবার কখনো কিছুটা কমছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ চালের দামে ওঠানামা থাকলেও সুগন্ধি চালের দাম তুলনামূলক বেশি বেড়েছে। এক মাস আগে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সুগন্ধি চাল কেজিপ্রতি ১৬০ থেকে ২০০ টাকায় পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা ১৭০ থেকে ২১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সোলার পণ্যেও কমেনি দামদেশে জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সৌরবিদ্যুতের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। তবে সোলার পণ্যে শুল্ক-কর কমানো হলেও বাজারে এর দাম কমেনি। চাহিদা বাড়ার সুযোগে কোনো কোনো পণ্যের দাম আরও বেড়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ৫৫০ ওয়াটের একটি সোলার প্যানেল ১৩ হাজার ৫০০ থেকে ১৯ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৫ কিলোওয়াটের ইনভার্টারের দাম ৪৮ হাজার থেকে ৭৭ হাজার টাকা। আর ৫ দশমিক ১২ কিলোওয়াট-ঘণ্টার লিথিয়াম ব্যাটারির দাম ৯৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারি—এই তিনটি প্রধান উপকরণ কিনতেই খরচ হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। ফলে করহার কমার পর দাম কমার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নতুন অর্থবছরের ব্যবস্থায় লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য করা হয়েছে। সোলার প্যানেলের শুল্কও ১ শতাংশ থেকে শূন্য করা হয়েছে। সোলার ইনভার্টারসহ বিভিন্ন উপকরণেও শুল্ক-কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, প্রিন্টার ও মনিটরসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যে কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ইলেকট্রিক ভেহিক্যালেও করছাড় রয়েছে। কিন্তু এসব সুবিধার বড় অংশেরই ইতিবাচক প্রভাব এখনো খুচরা বাজারে দৃশ্যমান নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, করছাড়ের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের জন্য পণ্যের দাম কমানো। তাই রাজস্ব সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দাম কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, তার নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। অন্যথায় সরকারের দেওয়া করছাড়ের সুফল ভোক্তার বদলে ব্যবসার বিভিন্ন স্তরেই আটকে থাকার আশঙ্কা থেকে যায়।




