Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
ইসলামপুর

বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার আব্দুল বারিকের বিদায়

বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার আব্দুল বারিকের বিদায়

এহসানুল মাহবুব ।।

দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য কিশোর বয়সেই হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে ছিনিয়ে এনেছিলেন স্বাধীনতার লাল-সবুজ পতাকা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও থেমে থাকেননি। স্বাধীন ভূখণ্ডের সীমান্ত সুরক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসরেও কাটিয়েছেন মানুষের সেবায়। এমনই এক দেশপ্রেমিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মানবিক মানুষ ছিলেন সুবেদার আব্দুল বারিক।
মো. আব্দুল বারিকের জন্ম ১৯৫৫ সালের ১৫ জুলাই, জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে। শৈশব থেকেই শান্ত, নম্র, বিনয়ী ও পরোপকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। দেশ ও মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাঁকে কৈশোরেই এক অসাধারণ সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করে।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বর নির্যাতন চালাচ্ছিল, তখন মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার প্রত্যয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন আব্দুল বারিক। মাত্র ১৬ বছর বয়সে দেশের স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন রণাঙ্গনে। জামালপুর অঞ্চলের ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেন তিনি। তাঁর মতো অসংখ্য তরুণের আত্মত্যাগ ও বীরত্বের মধ্য দিয়েই অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

স্বাধীনতার পর দেশের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধের অবসান ঘটেনি। যে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন, সেই দেশের সীমান্ত নিরাপদ রাখার দায়িত্ব নেন নিজের কাঁধে। যোগ দেন বাংলাদেশ রাইফেলস—বিডিআরে, যা বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নামে পরিচিত। দীর্ঘ কর্মজীবনে সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব পালন করে সুবেদার পদে অবসর গ্রহণ করেন তিনি।
মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় কিংবা সরকারি চাকরির প্রভাবকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের প্রবণতা থেকে দূরে ছিলেন আব্দুল বারিক। তাঁর তিন ছেলে ও এক মেয়ের কাউকেই মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুযোগ ব্যবহার করে সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেননি বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। সন্তানদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তাঁর এই অবস্থান সততা, আত্মমর্যাদা ও নৈতিক মূল্যবোধের এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরও মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন এই প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা। নিজের অর্থায়নে মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনের ব্যয়ভার বহন করতেন। অবসরকালীন ভাতার অর্থ থেকেও ধর্মীয় ও মানবিক কাজে সহযোগিতা করতেন তিনি। নিজের উপার্জিত অর্থের একটি অংশ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার মধ্যেই খুঁজে নিতেন মানসিক প্রশান্তি।
কর্মজীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে জীবনের শেষ অধ্যায়েও তিনি ছিলেন পরিবারের অভিভাবক এবং মানুষের শ্রদ্ধাভাজন। কিন্তু ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর স্ট্রোকজনিত কারণে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।
পরে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার আম্বাড়িয়া গ্রামে তাঁর বর্তমান ঠিকানায় নিজ বাড়ির সামনে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে পরিবার-পরিজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া।

একজন মানুষের জীবনের মূল্য শুধু তাঁর পদ-পদবি কিংবা অর্জনে সীমাবদ্ধ থাকে না; তাঁর আদর্শ, দায়িত্ববোধ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসাও তাঁকে স্মরণীয় করে রাখে। আব্দুল বারিকের জীবন সেই সত্যেরই প্রতিচ্ছবি। কিশোর বয়সে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ, স্বাধীনতার পর সীমান্ত রক্ষায় দীর্ঘ চাকরিজীবন এবং অবসরজীবনে মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন দেশপ্রেম ও মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

দেশের স্বাধীনতা অর্জন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব পালন—জীবনের দুই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে দেশকে সেবা দিয়েছেন তিনি। নিভৃতে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এই বীরের জীবনগাথা নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম, সততা ও দায়িত্বশীলতার শিক্ষা দেবে। রাষ্ট্রের জন্য তাঁর অবদান এবং মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies