জেলা প্রতিনিধি, জামালপুরঃ
দেড় শতাধিক বছরের প্রাচীন জামালপুর শহরে বাড়ছে জনসংখ্যা ও নগরায়ণের চাপ। তবে সে অনুযায়ী বাড়েনি নাগরিক সেবা ও অবকাঠামো। পানি সংকট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা ও যানজটে ভোগান্তিতে রয়েছেন পৌরবাসী। এসব সমস্যা সমাধানে ২০২৬ থেকে ২০৪৫ সাল পর্যন্ত ২০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জেলা পরিষদ মিলনায়তনে ‘জামালপুর নাগরিক কল্যাণ পরিষদ’ আয়োজিত ‘জামালপুর পৌরসভার নাগরিকদের মৌলিক সমস্যা, সম্ভাবনা ও উন্নয়ন ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় উঠে আসে।
সভায় বলা হয়, ১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত জামালপুর শহর ১৯৯৩ সালে ‘এ’ শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত হয়। বর্তমানে ৫৩ দশমিক ২৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই পৌর এলাকায় প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার মানুষের বসবাস। জনসংখ্যা বাড়লেও নাগরিক সেবার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি।
পৌরসভার মাত্র ৩ হাজার ২৯৭টি পরিবার বা ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ হোল্ডিং পাইপলাইনের পানির আওতায় রয়েছে। পৌরসভা থেকে দিনে গড়ে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা পানি সরবরাহ করা হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানির সংকটে রয়েছেন।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। পৌরসভায় পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার বা এফএসটিপি এবং পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে পড়ছে বলে সভায় জানানো হয়।
গত এক দশকে জামালপুরে জামালপুর মেডিকেল কলেজ, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৪৩৬ একরের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে শহরের পরিধি ও জনসংখ্যার চাপ দ্রুত বাড়ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, ২০৪০ সালের মধ্যে জামালপুর শহরের জনসংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাই চার দশক আগের পুরোনো পরিকল্পনা দিয়ে ভবিষ্যতের নগরায়ণের চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
সংকট উত্তরণে ২০২৬ থেকে ২০৪৫ সাল পর্যন্ত ২০ বছর মেয়াদি সমন্বিত মহাপরিকল্পনার প্রস্তাব করা হয়। এতে যানজট কমাতে রিং রোড ও সবুজ বলয় তৈরি, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে আধুনিক ওয়াকওয়ে নির্মাণ, বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন এবং জিআইএসভিত্তিক ডিজিটাল পৌরসেবা চালুর সুপারিশ করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট মো. মুজিবুর রহমান বলেন, জামালপুর শহরকে ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হলে এখনই দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শুধু বর্তমান সমস্যা সমাধান করলে হবে না, আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরে শহরের জনসংখ্যা, যানবাহন, আবাসন, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের ওপর কী ধরনের চাপ তৈরি হবে, সেটি বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আইনি কাঠামো ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি।
অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন বলেন, জামালপুরের উন্নয়নকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে হবে না। শহরের সড়ক, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও নাগরিক সেবাকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি বাসযোগ্য ও টেকসই শহর গড়ে তোলা সম্ভব।
সংগঠনের আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ রুহানি বলেন, জামালপুরকে আধুনিক ও টেকসই নগরে রূপ দিতে হলে নাগরিকদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মহাপরিকল্পনাকে আইনগত ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।




