ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মহানগরীর ভোগড়া, নাওজোড়, মৌচাক ও কালিয়াকৈরের পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় এসব সংঘর্ষ হয়। এতে পুলিশ ও শ্রমিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। এ সময় সাতজনকে আটক করেছে শিল্প পুলিশ।
শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে কয়েক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে দুই মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও বিজিবি টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিপেটা করে।
শিল্প পুলিশ ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মহানগরীর নাওজোড় এলাকায় প্যানিসিয়া লিমিটেডের শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের উড়ালসেতুর পশ্চিম পাশে জড়ো হন। একপর্যায়ে তাঁরা মহাসড়ক অবরোধ করলে দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
একই সময়ে কোনাবাড়ীর বে-ফুটওয়্যার, মৌচাক এলাকার পূর্বানী এবং তেলিচালা এলাকার লগোস অ্যাপারেলস ও এটিএস অ্যাপারেলসের শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে কারখানা থেকে বেরিয়ে আসেন। পরে তাঁরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও বিজিবি টিয়ারশেল এবং সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের সরিয়ে দেয়। এরপর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
অন্যদিকে, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভোগড়া এলাকায় কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ করেন। খবর পেয়ে শিল্প পুলিশ, বিজিবি, জেলা ও মহানগর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। এ সময় শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা করা হলে হঠাৎ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও লাঠিপেটা করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এদিকে, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। সেখানে পুলিশ ও বিজিবি টিয়ারশেল এবং সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানান, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অন্তত ৬০টি কারখানা কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার বেলা ১১টার পর ছুটি ঘোষণা করেছে। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক এবং বেলা ১১টা থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল।
তিনি বলেন, প্রায় আধা ঘণ্টা পর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। অন্যদিকে, প্রায় তিন ঘণ্টা পর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক থেকেও শ্রমিকদের সরানো সম্ভব হয়।
পুলিশ সুপার আরও জানান, এর আগে সকাল পৌনে ৮টার দিকে কালিয়াকৈরের মৌচাক এলাকায় কয়েকজন শ্রমিক ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন। পুলিশ তাঁদের কোনো সংঘাত ছাড়াই সরিয়ে দেয়। একই সময়ে পল্লী বিদ্যুৎ মোড়েও সড়ক অবরোধের চেষ্টা করা হলে পুলিশ ও বিজিবি গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। শ্রমিক বিক্ষোভের সময় আটক সাতজনকে কারখানার শ্রমিক নয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, সকাল থেকেই মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ অবস্থান নেয়। নাওজোড় ও ভোগড়া এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে আলোচনার একপর্যায়ে হঠাৎ ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। কেউ কেউ পরিস্থিতিকে ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে। নাওজোড় ও ভোগড়া বাইপাস এলাকার ব্যারিকেড সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক।
উল্লেখ্য, গত শনিবার থেকে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলছে। এ সময় সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় পুলিশ ও সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। পুলিশের গাড়ি, বিভিন্ন যানবাহন এবং কারখানার গুদামেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এসব ঘটনায় কোনাবাড়ী, বাসন ও কালিয়াকৈর থানায় তিনটি মামলা করেছে পুলিশ। মামলাগুলোতে কয়েক হাজার শ্রমিককে আসামি করা হয়েছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া ও উসকানি দেওয়ার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।




