আলজাজিরা: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কার মধ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার পথ তৈরি করতে কাতারের মধ্যস্থতায় দুই দিনের একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছেন ইরানি কর্মকর্তারা। তবে আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত থাকলেও দুই পক্ষই নতুন করে সামরিক সংঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকার কথা জানাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সর্বশেষ আলোচনাকে ‘ভালোভাবে এগোচ্ছে’ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের এখনো কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে ব্যবস্থা নেওয়া বাকি রয়েছে। অন্যদিকে ইরানের নেতারা কূটনীতির প্রতি আগ্রহ দেখালেও নতুন করে হামলা হলে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
আলোচনার অগ্রগতি কোথায়?
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতে শনিবার ইরানের একটি প্রতিনিধিদল দোহায় গেছে। ওই দলে তাঁর একজন সহযোগীও ছিলেন। এর আগে কাতারের কর্মকর্তারাও তেহরান সফর করে ইরানি নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
আরাগচির ভাষ্য অনুযায়ী, দোহায় আলোচনার মূল বিষয় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু করা। তেহরানের কয়েকটি শর্ত পূরণ করা হলে দুই দিনের মধ্যে প্রণালিটি খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে, সম্প্রতি আরোপ করা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জুনে দেওয়া তেল রপ্তানিসংক্রান্ত ছাড় পুনর্বহাল, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো, হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও ওমানের নির্ধারিত নতুন নৌপথের স্বীকৃতি এবং লেবাননে ইসরায়েলের হামলাসহ সব фрон্টে সংঘাত বন্ধ করা।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তেহরানের এসব শর্ত নিয়ে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এ বিষয়ে একাধিকবার তেহরান সফর করেছেন। গত জুনে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ক্ষেত্রেও কাতার ও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে আগস্টে সেই সমঝোতা ভেঙে যায়।
ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত মেনে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যদিও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, কাতারের নেতৃত্বে আলোচনা চলছে। তবে এ আলোচনার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তাঁর ভাষায়, আলোচনা কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ থাকলে যুক্তরাষ্ট্র তাতে আগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে পরিবর্তন দেখছে ইরান
নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরুর পেছনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের একটি চিঠিকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ির কাছে চিঠিটি পাঠানো হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করার সম্ভাবনা যাচাই এবং নতুন করে সামরিক সংঘাত এড়ানোর পথ খোঁজা।
শনিবার চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন রেজায়ি। তিনি বলেন, আগের চিঠিগুলোর তুলনায় এবার মার্কিন পক্ষের বক্তব্যের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচিও চিঠিটি পর্যালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, সংলাপ ও পারস্পরিক সমঝোতার পথ তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য যদি ইরানের অভ্যন্তরে বিভেদ সৃষ্টি করা হয়, তাহলে সেটি হবে দেশটির আগের ভুলগুলোর ধারাবাহিকতা।
শান্তির পাশাপাশি যুদ্ধের প্রস্তুতি
ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত মেনে নিলে শান্তি আলোচনা সম্ভব। তবে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে ইরান আগের চেয়ে কঠোরভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
আরাগচি আলজাজিরাকে বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি প্রস্তুত। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের পক্ষ থেকে নতুন কোনো সামরিক হুমকি এলে ইরানের জবাব হবে তাৎক্ষণিক এবং ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
তিনি সামরিক কমান্ডারদের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট শত্রুপক্ষের সব ধরনের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পদকে লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান রেজায়িও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ভবিষ্যতে কোনো হামলা হলে জবাব দিতে নতুন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করবে তাঁর দেশ। একই সঙ্গে ইরান তাদের পারমাণবিক নীতিতে পরিবর্তনের বিষয়টিও বিবেচনা করছে বলে জানান তিনি।
বর্তমানে ইরানের ঘোষিত পারমাণবিক নীতিতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি নিষিদ্ধ রয়েছে। তবে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলছে। ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। অন্যদিকে তেহরানের দাবি, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে দ্বিধার ইঙ্গিত
শান্তি আলোচনা নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যে পরস্পরবিরোধী অবস্থান দেখা যাচ্ছে। শনিবার তিনি আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে বলে মন্তব্য করলেও একই সঙ্গে বলেছেন, আলোচনার ওপর খুব বেশি ভরসা করা যাচ্ছে না।
তিনি ইরানের কয়েকটি স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নামে পরিচিত একটি সন্দেহভাজন ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাও রয়েছে।
ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সামরিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে। তবে এ বিষয়ে তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই।
এর আগে তিনি ইরানে নতুন করে হামলা চালিয়ে দেশটিকে পুরোপুরি দুর্বল করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর স্বল্প সময়ের জন্য তীব্র সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখে উপসাগরীয় মিত্রদের প্রস্তুত থাকতে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর বিষয়ে ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তবে প্রয়োজন হলে সামরিক লক্ষ্য অর্জনের সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েলও
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যে ইসরায়েলের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের বরাত দিয়ে দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের হুমকি স্থায়ীভাবে দূর করার ক্ষেত্রে তাঁদের সামনে ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক আইনসভা নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, নেতানিয়াহুর সামরিক হুমকি ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও জটিল করে তুলছে। কারণ, তেহরানের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি হলেও ইসরায়েলের নতুন হামলার ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হবে না।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর রাজনৈতিকবিষয়ক উপপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদোল্লাহ জাভানি বলেছেন, যেকোনো মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল হামলা চালাতে পারে, এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই ইরানি বাহিনী তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
কূটনীতি ও সামরিক প্রস্তুতি একসঙ্গে কেন?
ইরানবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংকট পর্যবেক্ষণ সংস্থার জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, তেহরান একদিকে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য নতুন যুদ্ধের সামরিক হিসাব-নিকাশও বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, আপাতত কূটনৈতিক তৎপরতা ও সামরিক প্রস্তুতি পাশাপাশি চলছে। ইরানের অবস্থান থেকে মনে হচ্ছে, সমঝোতার সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। তবে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তা আগের নিয়মে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তাঁর মতে, ইরানের এই হুঁশিয়ারিকে ওয়াশিংটন কতটা বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ হিসেবে দেখছে, আর কতটা উত্তেজনা বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে বিবেচনা করছে, তার ওপর পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।
অধ্যাপক ক্রিগ মনে করেন, ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন ইরানকে আপাতত ছাড় না দেওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করতে পারে। কারণ, নির্বাচনের আগে কোনো সমঝোতা হলে ট্রাম্প রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারেন। তবে নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। তখন সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধা তুলনামূলক কম থাকবে।
ক্রিগের আশঙ্কা, এমন পরিস্থিতিতে একটি অদ্ভুত সমীকরণ তৈরি হতে পারে। ওয়াশিংটন যখন সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে আরও আগ্রহী হয়ে উঠবে, ঠিক তখনই তেহরান সমঝোতায় পৌঁছাতে বেশি আগ্রহ দেখাতে পারে। ফলে চলমান কূটনৈতিক উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধ ঠেকাতে কতটা সফল হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।




