Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
জাতীয়

নিরাপদ খাদ্য পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ: ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

নিরাপদ খাদ্য পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ: ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

ক্ষুধা মেটানোর মতো খাবার পাওয়া গেলেও তা কতটা নিরাপদ, সেই প্রশ্ন এখন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। চাল, মাছ, ভোজ্যতেল ও দুধ থেকে শুরু করে রাস্তার খাবার এবং রেস্তোরাঁর সালাদেও ক্ষতিকর রাসায়নিক, ভারী ধাতু, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দৈনিক আমার দেশের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সীমিত জনবল, দুর্বল তদারকি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা গ্রহণের ঘাটতিতে দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিরাপদ খাদ্য তাৎক্ষণিকভাবে ডায়রিয়া ও খাদ্যে বিষক্রিয়ার মতো রোগ সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতিসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু ক্ষতিকর পদার্থের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশে অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে বছরে প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৪২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১১৫ জনের প্রাণহানি ঘটে। তবে এ পরিসংখ্যানের উৎস, হিসাবের পদ্ধতি ও প্রযোজ্যতার বিষয়টি যাচাই করা জরুরি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, দূষিত খাবারে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী ও রাসায়নিক পদার্থ বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক সেমিনারে বলা হয়েছিল, দেশের প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। নিরাপদ খাদ্যের ঘাটতি জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি দেশের খাদ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

চালেও মিলছে ভারী ধাতু

সম্প্রতি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা গবেষণাগারের এক গবেষণায় পরীক্ষিত ২৩২টি চালের নমুনার মধ্যে ১৩১টিতে ক্রোমিয়াম, ১৩০টিতে ক্যাডমিয়াম ও সিসা এবং ৮৩টিতে আর্সেনিক পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ভারী ধাতুর দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতিসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষিত নমুনায় দূষণের হার ২০২৩ অর্থবছরে সাড়ে ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ অর্থবছরে ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নমুনার সংখ্যা, সংগ্রহপদ্ধতি ও দূষণের ধরন বিবেচনায় না নিয়ে এ হারকে দেশের সামগ্রিক খাদ্যদূষণের প্রকৃত চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ব্যাকটেরিয়া, রাসায়নিক ও বিষাক্ত উপাদানযুক্ত খাবার মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক। ঘি, গুড়, মধু, মিষ্টি, হলুদ, মরিচের গুঁড়া, গুঁড়া দুধ ও লবণের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

তিনি খাবার পরিষ্কার রাখা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা এবং নিরাপদ পানি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি পাঠ্যক্রমেও নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।

তেল, দুধ ও মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

খাদ্যদূষণের নতুন উদ্বেগের নাম মাইক্রোপ্লাস্টিক। ২০২৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় ঢাকার বাজার থেকে সংগ্রহ করা ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা বিশ্লেষণ করে প্রতি লিটারে গড়ে প্রায় ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। গবেষণায় খোলা তেলে বোতলজাত তেলের তুলনায় এসব কণার পরিমাণ বেশি পাওয়া যায়।

২০২৫ সালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ধরনের দুধেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. শাহজাহানের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় আড়িয়াল বিলের কই, বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি মাছেও এসব কণার উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে।

গবেষকদের মতে, প্লাস্টিক বর্জ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও সংরক্ষণের বিভিন্ন পর্যায় থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যচক্রে প্রবেশ করতে পারে। তবে মানুষের শরীরে এসব কণার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

রাস্তার খাবারেও জীবাণুর ঝুঁকি

প্যাকেটজাত খাদ্যের পাশাপাশি রাস্তার খাবার ও রেস্তোরাঁয় পরিবেশিত খাবারেও জীবাণু দূষণের ঝুঁকি রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান গবেষক ড. লতিফুল বারীর গবেষণায় রাস্তার খাবার, সালাদ, জুস ও শরবতের নমুনায় ই-কোলাই, সালমোনেলা ও ভিব্রিওর মতো রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে।

গবেষণায় চানাচুর মাখা ও ছোলা-মুড়িতে ই-কোলাই, অ্যালোভেরা শরবতে সালমোনেলা এবং চটপটিতে ভিব্রিওর উপস্থিতি বা সংক্রমণের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অপরিচ্ছন্ন পানি, খোলা অবস্থায় খাবার রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানাকে এসব দূষণের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মণ্ডল জানান, রান্না করা খাবার ও কাঁচা মাংস একসঙ্গে রাখা এবং দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা খাবারে রং মেশানোর মতো অনিয়ম তাঁরা দেখেছেন। তাঁর ভাষ্য, এক প্লেট ফুচকায় সাত কোটিরও বেশি ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব খাবারে মলমূত্রবাহিত জীবাণুও শনাক্ত হয়েছে বলে তিনি জানান।

বর্জ্য থেকে খাদ্যচক্রে ভারী ধাতু

বিভিন্ন গবেষণায় ঢাকার আমিনবাজার ও মাতুয়াইল, চট্টগ্রামের আনন্দবাজার এবং সিলেটের মগরা বাজারের ল্যান্ডফিলসংলগ্ন জলাশয় ও কৃষিজমির ফসলে ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, সিসা, নিকেল ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলেকট্রনিক ও ধাতব বর্জ্য থেকে এসব উপাদান মাটি ও পানিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বর্জ্য থেকে নির্গত দূষিত তরল বা লিচেটের মাধ্যমে ভারী ধাতু জলাশয় ও কৃষিজমিতে পৌঁছে খাদ্যচক্রে প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে।

২০১৮ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকার গর্ভবতী নারীদের রক্তে সিসার উপস্থিতি পাওয়া যায়। একই বছরে ঢাকার ৫০০ শিশুর ওপর পরিচালিত আরেক গবেষণায় ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসা শনাক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। সিসাসহ বিভিন্ন ভারী ধাতুর সংস্পর্শ শিশুদের স্নায়বিক বিকাশ ও স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।

খাদ্য ও পানির মাধ্যমে এসব ভারী ধাতু শরীরে প্রবেশ করলে পরিপাকতন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে। কিছু পদার্থের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। গ্লোবাল ক্যানসার অবজারভেটরির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বাংলাদেশে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৭৫ জন নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং ক্যানসারজনিত কারণে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৯০ জনের মৃত্যু হয়। তবে এসব ক্যানসার আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যাকে সরাসরি খাদ্যদূষণের ফল হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

নজরদারিতে জনবল সংকট

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর সীমিত জনবলও বড় বাধা। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সচিব শ্রাবস্তী রায়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সীমিত জনবল দিয়ে বিপুলসংখ্যক হোটেল-রেস্তোরাঁ ও খাদ্যপ্রতিষ্ঠান তদারকি করতে হচ্ছে।

বাধ্যতামূলক গ্রেডিং, নিয়মিত নজরদারি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা কার্যকর না হলে অভিযান চালানোর পরও আগের পরিস্থিতি ফিরে আসতে পারে। ফলে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।

এদিকে গত ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ে খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা ও ভেজাল শনাক্তে ব্যবহৃত একটি ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার পরিদর্শন করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁকে পরীক্ষাগারের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করেন। বর্তমানে আটটি মহানগরে এ ধরনের পরীক্ষাগারের মাধ্যমে কার্যক্রম চলছে এবং পর্যায়ক্রমে ৬৪ জেলায় তা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালের নিরাপদ খাদ্য আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপন, দক্ষ জনবল বৃদ্ধি এবং খাদ্য উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ শনাক্ত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার এবং পরীক্ষার ফল স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করাও প্রয়োজন।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। উৎপাদক, ব্যবসায়ী, পরিবেশক ও ভোক্তা, সবারই এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব রয়েছে। খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনে স্বাস্থ্যবিধি মানা, অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কঠিন।

দেশে খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়ানো যেমন জরুরি, তেমনি সেই খাদ্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর কি না, তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ খাবার মানুষের ক্ষুধা মেটাবে, জীবন ও স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে না, এটাই হওয়া উচিত খাদ্যব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies