শরতের নীল আকাশ, বর্ষার বিদায়ী জল আর নদীর বুকে শত বৈঠার ছন্দ—সব মিলিয়ে আবারও প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। দেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও জলাশয়ে দীর্ঘ বিরতির পর আয়োজিত হচ্ছে নৌকাবাইচ। এতে সারিগানের সুর, মাঝিদের ছন্দময় বৈঠা আর তীরজুড়ে মানুষের উচ্ছ্বাসে ফিরে আসছে গ্রামবাংলার চিরচেনা লোকজ আবহ।
বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের ঘোড়াউত্রা, ঢাকার বুড়িগঙ্গা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস, ফরিদপুরের কুমার ও মানিকগঞ্জের কালীগঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন নদীতে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর এসব আয়োজনকে ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ নৌকাবাইচ। বর্ষায় নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় পানিতে ভরে উঠলে বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয় এ জল-উৎসব। এটি শুধু প্রতিযোগিতা নয়, বরং গ্রামীণ মানুষের মিলন, আনন্দ ও সম্প্রীতিরও বড় উপলক্ষ।
শত বৈঠায় গতির লড়াই
নৌকাবাইচের জন্য ব্যবহৃত নৌকা সাধারণ নৌকার চেয়ে আলাদা। ছিপ, কোষা, খেলনা, ময়ূরপঙ্খী, গয়না ও ঘাসীসহ বিভিন্ন ধরনের বিশেষ নৌকা এ প্রতিযোগিতায় ব্যবহৃত হয়। অনেক নৌকা ১০০ থেকে ২০০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। কাঠের নকশা ও বাহারি রঙে সাজানো এসব নৌকা নদীর বুকে প্রতিযোগিতাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
একেকটি নৌকায় থাকে কয়েক ডজন থেকে শতাধিক মাঝি বা মাল্লা। একই ধরনের পোশাক পরে তারা সারিবদ্ধভাবে বৈঠা চালান। দলনেতার নির্দেশনা এবং সারিগানের তালে তালে একসঙ্গে পানিতে পড়ে শত শত বৈঠা। নদীর বুকে তখন সৃষ্টি হয় গতি ও ছন্দের অনন্য দৃশ্য।
তীরে লাখো মানুষের ভিড়
নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে নদীর দুই পাড়ে বসে মানুষের মিলনমেলা। অনেকে তীরে দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন, আবার কেউ ছোট নৌকা বা ট্রলারে করে নদীর মাঝেও অবস্থান নেন। ঢাক-ঢোল, করতালি ও সারিগানের শব্দে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
ধর্ম-বর্ণ ও বয়সের ভেদাভেদ ভুলে মানুষ এতে অংশ নেয়। ফলে নৌকাবাইচ পরিণত হয় বৃহত্তর লোকজ উৎসবে।
বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন রূপ
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নৌকাবাইচের ধরনেও রয়েছে বৈচিত্র্য। সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে দীর্ঘ ও সরু নৌকায় বাইচের আয়োজন হয়। পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোরের চলনবিল এলাকায় ছিপ ও কোষা নৌকার ব্যবহার বেশি দেখা যায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীতে ময়ূরপঙ্খী ও ছিপ নৌকার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। ফরিদপুরের কুমার নদে কোষা ও বাচারি নৌকা ব্যবহারের ঐতিহ্য রয়েছে। কিশোরগঞ্জের ঘোড়াউত্রা নদীতেও দীর্ঘ বিরতির পর নৌকাবাইচ ফিরে এসেছে।
গত ৩ অক্টোবর মানিকগঞ্জের কালীগঙ্গা নদীর বেউথা এলাকায় অনুষ্ঠিত নৌকাবাইচেও ছিল ব্যাপক জনসমাগম। বিভিন্ন শ্রেণির ২২টি নৌকা এতে অংশ নেয়। প্রতিযোগিতাকে ঘিরে নদীর দুই পাড়ে বসে লোকজ মেলা ও বিনোদনের নানা আয়োজন।
আধুনিকতার মাঝেও অটুট ঐতিহ্য
আধুনিক বিনোদনের বিস্তারের মধ্যেও নৌকাবাইচ তার আবেদন ধরে রেখেছে। বরং দীর্ঘ বিরতির পর বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে এসব আয়োজন শুরু হওয়ায় লোকজ ঐতিহ্যটি আবারও মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
নৌকাবাইচ শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়; এটি বাংলার নদী, মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি ঐতিহ্য। শত মাঝির একসঙ্গে বৈঠা চালানোর দৃশ্য যেমন বাঙালির সাহস ও সামষ্টিক শক্তির প্রতীক, তেমনি নদীর সঙ্গে মানুষের ঐতিহাসিক সম্পর্কেরও স্মারক।
বাংলার এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে নদীগুলোকে দূষণমুক্ত রাখা এবং নিয়মিত নৌকাবাইচ ও লোকজ উৎসবের আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




