সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ-সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনায় বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখলদারি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে—মিষ্টির পদত্যাগের মধ্য দিয়ে এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে যুগান্তর জানায়, দলের ভেতরে অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবেই মিষ্টিকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের তদন্তও চলছে। একই সময়ে বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।
ওই কমিটির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিক ও ইসিবি চত্বরে হামলার ঘটনায় কর্মীদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনার পর দলটির বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের অনেকেই সতর্ক হয়ে গেছেন বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্তদের মধ্যেও এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি আন্ডারওয়ার্ল্ডের সক্রিয় গ্যাং ও অপরাধী চক্রগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের গ্রেফতারে বিশেষ টিম কাজ শুরু করেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—অপকর্মের সঙ্গে জড়িত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আনুষ্ঠানিক চিঠি না গেলেও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বিষয়টি মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছেন।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি শুক্রবার রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নীতি ও সুশাসনের প্রতি দৃঢ় অবস্থানের কারণেই সংসদ-সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলেও তিনি জানান।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড মডেল থানার প্রধান ফটকের সামনে গাড়ি রাখা নিয়ে এক পুলিশ সদস্যকে মারধরের ঘটনায় চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সহসভাপতি ইসমাইল হোসেনকে দলের সব পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়।
তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ মিষ্টির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে ‘যুগান্তকারী’ বলে মন্তব্য করেছেন। যুগান্তরকে তিনি বলেন, সরকারের নাম ভাঙিয়ে যারা দেশের ও দলের ক্ষতি করছেন, তাদের জন্য এ সিদ্ধান্ত বড় সতর্কবার্তা। ব্যক্তিগত স্বার্থ, চাঁদাবাজি কিংবা কোনো ধরনের অপকর্মের দায় সরকার বা দল নেবে না বলেও তিনি জানান।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রশ্রয় ও দলীয় পরিচয়ের আড়ালে দায়মুক্তির সংস্কৃতি বড় বাধা। নিজ দলের প্রভাবশালী নেতা বা সংসদ-সদস্যের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হলে অপরাধীদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়। এই নীতি মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী চক্রের শিকড় দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দল বা সরকারের পদ-পদবি ব্যবহার করে পার পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, মিরপুরে রাড্ডা ক্লিনিক ভাঙচুর এবং ইসিবি চত্বরে নিউ গিনি প্রোপার্টিজে হামলার ঘটনায় সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। এরপরই অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
স্পেশাল অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ বলেন, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও অস্ত্রধারীদের আস্তানায় অভিযান চালানো হচ্ছে। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, অপরাধী যত প্রভাবশালী বা যে দলেরই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। নগরবাসীর নিরাপত্তায় চলমান অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
উত্তরা পূর্ব থানার ওসি মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম জানান, এলাকায় চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরি করে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ওপরের মহল থেকে কঠোর বার্তা পাওয়ার পর অনেক অপরাধী আত্মগোপনে চলে যাচ্ছে। অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।
শুদ্ধি অভিযান নিয়ে বিএনপির ভেতরেও আলোচনা চলছে। দলের নেতাকর্মীদের অনেকেই বলছেন, অন্যায় বা অপরাধ করে এখন আর পার পাওয়ার সুযোগ নেই। দলীয় পরিচয়ের আড়ালে অপরাধীদের প্রশ্রয় না দেওয়ার বিষয়ে কেন্দ্র থেকে কঠোর অবস্থানের বার্তা দেওয়া হয়েছে।
দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা এ প্রসঙ্গে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সময়ের নীতির কথা স্মরণ করছেন। তাদের মতে, দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের সেই ধারাই অনুসরণ করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা যুগান্তরকে বলেন, দলের ভাবমূর্তি সবার আগে। দলের ভেতরে থাকা অপকর্মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে নেতৃত্বের অবস্থান স্পষ্ট। ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘটনায় সেটিই প্রকাশ পেয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ ও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে দলের প্রতি আস্থা আরও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।




