ব্রহ্মপুত্রের তীরে পুরোনো একটি দোতলা ভবন। প্রশস্ত বারান্দা, লোহার সিঁড়ি আর ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপত্যশৈলী। সময়ের ক্ষত শরীরে নিয়েও ভবনটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। অথচ খুব কম মানুষই জানেন, এই ভবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা এ কে ফজলুল হকের স্মৃতি। একসময় এটি ছিল জামালপুরের এসডিও বাংলো। ১৯১৪ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত জামালপুর মহকুমার সাব-ডিভিশনাল অফিসার (এসডিও) হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় এখানেই বসবাস করতেন ফজলুল হক, যিনি পরবর্তী সময়ে বাঙালির কাছে ‘শেরে বাংলা’ নামে পরিচিত হন।
আজ সেই ঐতিহাসিক ভবনটি সদর উপজেলা ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভবনের সামনে নেই কোনো স্মৃতিফলক, নেই শেরে বাংলার জামালপুর অধ্যায় তুলে ধরার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা। দাপ্তরিক ব্যবহারের আড়ালে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই স্মৃতিচিহ্নটি যেন ধীরে ধীরে বিস্মৃতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
১৯০৬ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন ফজলুল হক। প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পর ১৯১৪ সালে তিনি জামালপুর মহকুমার এসডিও হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯১৭ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। জেলা প্রশাসকের কক্ষে বোর্ডে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নাম ও দায়িত্বপালনকাল আজও জ্বলজ্বল করছে।
সময়টি ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অস্থির। বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী টানাপোড়েন, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পরিস্থিতি প্রশাসনের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। জামালপুরেও সংঘাতের আশঙ্কা ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। প্রশাসক হিসেবে ফজলুল হক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ভূমিকা রাখেন।
তবে জামালপুর তার কাছে কেবল একটি প্রশাসনিক কর্মস্থল ছিল না। এই জনপদে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন কৃষকের জীবন, ঋণের বোঝা, জমিদার ও মহাজনদের প্রভাব এবং গ্রামীণ সমাজের নানা অসহায়তা। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তিনি বাংলার কৃষকসমাজের বাস্তব চিত্র প্রত্যক্ষ করেন। পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে কৃষকের অধিকার ও স্বার্থের প্রশ্নটি তার চিন্তায় যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নেয়, তার পেছনে এসব অভিজ্ঞতার ভূমিকা ছিল।
এই বাংলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি, ‘এসডিও ঘাট’। স্থানীয় প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী, বাংলোর পেছনেই ছিল ব্রহ্মপুত্রের একটি ঘাট। বাংলো থেকে লোহার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে বাগান পেরিয়ে নদীর ঘাটে যাওয়া যেত। শেরে বাংলার যাতায়াতের সূত্রেই ঘাটটি পরিচিত হয়ে ওঠে ‘এসডিও ঘাট’ নামে।
আজ সেই ঘাট নেই। নদীর গতিপথের পরিবর্তন, ভরাট এবং পরবর্তী সময়ে বাইপাস সড়ক নির্মাণে বদলে গেছে পুরো এলাকা। একসময় যে গোলাকার বাগান বাংলোটিকে ঘিরে রাখত, সেটিও বিলীন হয়েছে। বদলে গেছে চারপাশের পরিবেশ। হারিয়ে গেছে নদীর ঘাট, বাগান ও সেই সময়ের দৃশ্যপট। টিকে আছে কেবল পুরোনো বাংলোটি। তাই এসডিও বাংলোর গুরুত্ব এখন আরও বেশি। এটি শুধু একটি পুরোনো সরকারি ভবন নয়; হারিয়ে যাওয়া জামালপুরের একটি দৃশ্যমান স্মারক।
জামালপুর ও আশপাশের এলাকায় দায়িত্ব পালনের সময় ফজলুল হক কৃষকদের আর্থিক সংকট প্রত্যক্ষ করেন। শেরপুরের কামারের চরে অনুষ্ঠিত কৃষক মহাসম্মেলনে সভাপতিত্ব করে তিনি কৃষকদের অধিকার ও স্বার্থের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেন। কৃষকের ঋণসংকট মোকাবিলায় পরবর্তীকালে ঋণ সালিশি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ তার রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে ওঠে। কৃষকের দুঃখ-কষ্ট, ঋণের বোঝা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সংকট তার রাজনৈতিক দর্শনের ভিত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জামালপুরেই তার কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি হয়েছিল। সরকারি চাকরির সীমারেখা পেরিয়ে তিনি ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। পরবর্তী সময়ে বাংলার কৃষক-জনতার অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে তার উত্থান ঘটে। অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন থেকে শুরু করে উপমহাদেশের রাজনীতির নানা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তার ভূমিকা ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে আছে। কিন্তু সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় পড়ে আছে জামালপুরের এই পুরোনো বাংলোয়।
শেরে বাংলার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এমন একটি স্থাপনা থাকা সত্ত্বেও জামালপুরে তার স্মৃতি সংরক্ষণের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। নেই কোনো স্মৃতিফলক, নেই তার জামালপুরে কর্মজীবন নিয়ে স্থায়ী প্রদর্শনী। ভবনটি এখনো সরকারি কাজে ব্যবহৃত হলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ সীমিত।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন, জাতীয় ইতিহাসের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কি এভাবেই হারিয়ে যাবে?
তাদের দাবি, এসডিও বাংলোটি দাপ্তরিক ব্যবহারের বাইরে এনে ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষণ করা হোক। ভবনের মূল স্থাপত্য অক্ষুণ্ন রেখে সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হোক ‘শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক স্মৃতি জাদুঘর’।
এমন একটি জাদুঘর হলে সেখানে শুধু শেরে বাংলার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন নয়, বিশেষভাবে তুলে ধরা যেতে পারে জামালপুরে তার তিন বছরের কর্মজীবন। রাখা যেতে পারে পুরোনো জামালপুরের মানচিত্র, ব্রহ্মপুত্রের তৎকালীন গতিপথ, এসডিও ঘাটের ইতিহাস, পুরোনো আলোকচিত্র, প্রশাসনিক নথির অনুলিপি এবং স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে টিকে থাকা স্মৃতি। শিক্ষার্থী, গবেষক ও ইতিহাস-অনুসন্ধিৎসু মানুষের জন্য এটি হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসকেন্দ্র। একই সঙ্গে জামালপুরের পর্যটন ও সাংস্কৃতিক পরিচিতিতেও যোগ হতে পারে নতুন মাত্রা।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপদ সবসময় ধ্বংস নয়, বিস্মৃতিও। একটি ভবন যখন তার ইতিহাস হারায়, তখন সেটি কেবল একটি পুরোনো স্থাপনা হয়ে দাঁড়ায়। আর একটি সমাজ যখন সেই ইতিহাসকে সংরক্ষণ করে, তখন একই ভবন হয়ে ওঠে প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের সংযোগ।
জামালপুরের এসডিও বাংলো আজ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ব্রহ্মপুত্রের পুরোনো ঘাট নেই। নেই গোলাকার বাগান। বদলে গেছে চারপাশ। বদলে গেছে নদীর গতিপথও। কিন্তু বাংলোটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। তার দেয়ালে লেগে আছে এক শতাব্দী আগের জামালপুরের স্মৃতি এবং শেরে বাংলার কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
এই ভবনের প্রতিটি ইট, বারান্দা ও লোহার সিঁড়ি যেন সাক্ষ্য দেয় একটি সময়ের। যে সময়ে একজন তরুণ প্রশাসক এই জনপদের মানুষ, কৃষক ও সমাজব্যবস্থাকে কাছ থেকে দেখেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক চিন্তা ও কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলেছিল।
তাই এসডিও বাংলো সংরক্ষণ এখন শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা রক্ষার বিষয় নয়; এটি জামালপুরের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার দায়।
ভবনটি সংরক্ষণ করে ‘শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক স্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা করা গেলে হারিয়ে যাওয়া এসডিও ঘাটের স্মৃতিও ফিরে পাবে একটি স্থায়ী ঠিকানা। ইতিহাস পাবে একটি দৃশ্যমান দলিল। নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে, এই শহরের মাটিতে একসময় দায়িত্ব পালন করেছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি পরবর্তী সময়ে বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে নিজের জন্য স্থায়ী একটি অধ্যায় লিখেছিলেন। নইলে একদিন হয়তো এই বাংলোটিও হারিয়ে যাবে। তখন শেরে বাংলার জামালপুর অধ্যায় বেঁচে থাকবে কেবল মানুষের স্মৃতিতে, একটি ঘাটের নামের মতো, একটি হারানো বাগানের গল্পের মতো, কিংবা বিস্মৃত হয়ে যাওয়া এক সময়ের ম্লান স্মৃতির মতো।




