Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
ইতিহাস

জামালপুরের ইতিকথা-৫: বাহাদুরাবাদ ও জগন্নাথগঞ্জ ঘাটের হারানো দিন

জামালপুরের ইতিকথা-৫: বাহাদুরাবাদ ও জগন্নাথগঞ্জ ঘাটের হারানো দিন

ট্রেন থামত ঘাটে, বগি উঠত ফেরিতে। নদী পেরিয়ে আবার ছুটত রেল। এক পাড়ে এসে থামত ট্রেন। সামনে অথই যমুনা। রেললাইনের শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করত ফেরি। ট্রেনের বগি তুলে দেওয়া হতো ফেরিতে। হুইসেল বাজিয়ে ধীরে ধীরে ফেরি এগিয়ে যেত নদীর বুক চিরে। ওপারে পৌঁছে আবার বগি নামত রেললাইনে। তারপর শুরু হতো নতুন যাত্রা।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি কল্পকাহিনির মতো মনে হতে পারে। কিন্তু একসময় এটাই ছিল বাস্তবতা। যমুনার ওপর সেতু ছিল না, তবু থেমে থাকেনি রেল যোগাযোগ। নদীকে পেরোতে রেলই উঠত ফেরিতে।

জামালপুরের জগন্নাথগঞ্জ ও বাহাদুরাবাদ ঘাট ছিল সেই বিস্ময়কর যোগাযোগব্যবস্থার দুটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ঢাকা ও পূর্ববাংলা থেকে উত্তরবঙ্গের পথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে এই দুই ঘাট একসময় ছিল ব্যস্ততম রেল-নদী সংযোগস্থলগুলোর মধ্যে।

ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে পাট ও কৃষিপণ্য পরিবহনের প্রয়োজন বাড়তে থাকায় পূর্ববঙ্গে রেল যোগাযোগ দ্রুত বিস্তৃত হয়। ১৮৮৪–৮৫ সালে নারায়ণগঞ্জ-ময়মনসিংহ রেলপথ চালু হয়। পরে রেললাইন সম্প্রসারিত হয় জামালপুরে।

১৮৯৪ সালে জামালপুরে রেল আসে। ১৮৯৯ সালে রেললাইন পৌঁছে জগন্নাথগঞ্জ ঘাটে। জগন্নাথগঞ্জ হয়ে ওঠে যমুনার পূর্ব তীরের গুরুত্বপূর্ণ রেল টার্মিনাল। নদীর ওপারে সিরাজগঞ্জের সঙ্গে তৈরি হয় রেলফেরি যোগাযোগ। পরে ঈশ্বরদী–সিরাজগঞ্জ রেলপথ চালু হলে এই পথ দিয়ে পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ আরও বিস্তৃত হয়। রেলফেরিতে যাত্রীবাহী কোচের পাশাপাশি পণ্যবাহী ওয়াগনও নদী পার হতো। অর্থাৎ, সেতু ছিল না, কিন্তু রেল থেমে থাকেনি। রেললাইন শেষ হতো ঘাটে। আর যমুনার বুকের ওপর ফেরিই হয়ে উঠত রেলপথের সাময়িক সেতু।

জামালপুরের অন্য প্রান্তে তৈরি হয় আরেক গুরুত্বপূর্ণ রেলঘাট বাহাদুরাবাদ। ১৯১২ সালে জামালপুর থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত রেললাইন চালু হয়। যমুনার অপর পারে তিস্তামুখ ঘাটের সঙ্গে তৈরি হয় রেলফেরি যোগাযোগ। তিস্তামুখ ছিল সান্তাহার-কাউনিয়া রেলপথের সঙ্গে যুক্ত।

উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ ট্রেনে তিস্তামুখে আসতেন। তারপর ফেরিতে যমুনা পেরিয়ে পৌঁছাতেন বাহাদুরাবাদে। সেখান থেকে আবার ট্রেনে ময়মনসিংহ ও ঢাকার দিকে যাত্রা করতেন।

এই ব্যবস্থাই কয়েক দশক ধরে উত্তরবঙ্গ ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে মানুষের চলাচল এবং পণ্য পরিবহনের অন্যতম ভরসা ছিল। রেলফেরির ব্যবস্থাটি ছিল প্রকৌশলগতভাবে বিস্ময়কর। পুরো ট্রেন একসঙ্গে ফেরিতে উঠত না। প্রয়োজন অনুযায়ী বগি ও ওয়াগন আলাদা করে ফেরিতে তোলা হতো। ফেরির ওপর থাকা রেললাইনে বগি স্থাপন করে তা নিরাপদে নদী পার করা হতো। অপর পারে পৌঁছে আবার রেললাইনের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে বগিগুলো নিয়ে ট্রেন চলত গন্তব্যের দিকে। নদীর স্রোত, নাব্যতা, আবহাওয়া ও ফেরির ভারসাম্য, সবকিছু বিবেচনায় রেখেই পরিচালিত হতো এই ব্যবস্থা। দক্ষ রেলকর্মী ও ফেরিশ্রমিকদের সমন্বয় ছাড়া এটি সম্ভব ছিল না। আজকের সেতু ও আধুনিক রেল যোগাযোগের যুগে সেই দৃশ্য কল্পনা করাই কঠিন।

জগন্নাথগঞ্জ ও বাহাদুরাবাদ শুধু রেলস্টেশন ছিল না। ঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল ব্যস্ত জনপদ।

ট্রেন এলেই ঘাটে নামত মানুষের ঢল। কুলি-শ্রমিকের ব্যস্ততা, মালামাল ওঠানামা, দোকানিদের হাঁকডাক আর যাত্রীদের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠত নদীতীর।

বাহাদুরাবাদ ঘাটে ছিল স্টিমারঘাট, দোকানপাট, ভাতের হোটেল, ফলমূলের দোকান ও কনফেকশনারি। দূরদূরান্ত থেকে আসা যাত্রীদের অনেকের কাছে এসব দোকান ও খাবারের হোটেল ছিল পথের অপরিহার্য অংশ।

ঘাটকে কেন্দ্র করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান গড়ে উঠেছিল। রেলকর্মী, কুলি, ফেরিশ্রমিক, মাঝি ও ব্যবসায়ী, অসংখ্য মানুষের জীবন নির্ভর করত এই যোগাযোগব্যবস্থার ওপর। নদী শুধু যাতায়াতের পথ ছিল না; ছিল জীবিকারও পথ।

সময় বদলেছে। বদলেছে যমুনার গতিপথ ও নাব্যতাও।

তিস্তামুখ ঘাটে নৌযান চলাচল কঠিন হয়ে পড়লে ১৯৯০ সালে রেলফেরি ঘাট স্থানান্তর করা হয় গাইবান্ধার বালাসী ঘাটে। এরপরও রেলফেরিনির্ভর এই যোগাযোগ কিছুদিন টিকে ছিল। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মানুষ বালাসী ঘাটে এসে ফেরিতে যমুনা পার হয়ে বাহাদুরাবাদে পৌঁছাতেন। সেখান থেকে ট্রেনে ময়মনসিংহ ও ঢাকার দিকে যাত্রা করতেন। কিন্তু এই যাত্রা ছিল সময়সাপেক্ষ। ট্রেন থেকে ফেরি, ফেরি থেকে আবার ট্রেন, প্রতিটি ধাপেই ছিল অপেক্ষা। এর মধ্যেই যমুনার ওপর সেতু নির্মাণের কাজ এগিয়ে যায়।

সেতু এলো, শেষ হলো রেলফেরি।

১৯৯৮ সালে যমুনার ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হয়। পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে তৈরি হয় সরাসরি সড়ক ও রেল যোগাযোগ। ২০০৩ সালে সেতুর ওপর দিয়ে রেল চলাচল শুরু হলে পুরোনো রেলফেরি ব্যবস্থার প্রয়োজন আরও কমে যায়। বাহাদুরাবাদ–বালাসী রেলফেরির গুরুত্ব ক্রমে হারিয়ে যায়। একসময় বন্ধ হয়ে যায় সেই ঐতিহাসিক যাত্রী পারাপার।

উন্নয়নের সঙ্গে পুরোনো যোগাযোগব্যবস্থা হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু উন্নয়নের নতুন পথ তৈরি হওয়ার সঙ্গে পুরোনো পথের ইতিহাসও হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়।

কারণ একটি সেতু শুধু নদীর দুই তীরকে যুক্ত করে। একটি পুরোনো ঘাট যুক্ত করে একটি সময়কে আরেকটি সময়ের সঙ্গে।

রেলফেরি বন্ধ হওয়ার পর বাহাদুরাবাদ ঘাটের ব্যস্ততাও কমে যায়। এর সঙ্গে যমুনার ভাঙনে ঘাটের স্থাপনা, রেললাইন ও আশপাশের অনেক অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। যেখানে একসময় ট্রেনের হুইসেল, ফেরির ইঞ্জিন আর মানুষের কোলাহল ছিল, সেখানে ধীরে ধীরে নেমে আসে নীরবতা। ঘাটকে কেন্দ্র করে জীবিকা গড়ে তোলা ব্যবসায়ী, শ্রমিক, কুলি ও মাঝিদের জীবনেও আসে পরিবর্তন। একসময় যে জায়গায় মানুষের ঢল নামত, তা আজ অনেকের কাছে শুধু একটি নাম। জগন্নাথগঞ্জ ও বাহাদুরাবাদ। নামের ভেতরেই লুকিয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া এক যোগাযোগের যুগ।

জগন্নাথগঞ্জ ও বাহাদুরাবাদকে শুধু পুরোনো ঘাট হিসেবে দেখলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হারিয়ে যাবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের পুরোনো নথি, স্টেশন রেজিস্টার, রেলফেরির নকশা, ছবি, মানচিত্র ও টিকিট সংগ্রহ করে তৈরি করা যেতে পারে ডিজিটাল আর্কাইভ। প্রবীণ রেলকর্মী, ফেরিশ্রমিক, মাঝি, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে সংরক্ষণ করা যেতে পারে মৌখিক ইতিহাস। পুরোনো স্থাপনার কোনো চিহ্ন এখনো থাকলে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে তা চিহ্নিত ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। ঘাট এলাকায় স্থাপন করা যেতে পারে ইতিহাসসম্বলিত তথ্যফলক।

আর দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে ‘যমুনা রেল-নদী ঐতিহ্য কেন্দ্র’। সেখানে পুরোনো রেলফেরির প্রতিকৃতি, মানচিত্র, ছবি, নথি, টিকিট ও ঘাটকেন্দ্রিক মানুষের জীবনকথা তুলে ধরা যেতে পারে।

কারণ সেতু নির্মাণ করা যায়। নতুন রেললাইন বসানো যায়। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া একটি যুগকে দ্বিতীয়বার নির্মাণ করা যায় না। যমুনার বুক দিয়ে এখন আর রেলফেরি ছুটে না। নেই ট্রেনের অপেক্ষায় মানুষের দীর্ঘ সারি। নেই কুলিদের হাঁকডাক। নেই ফেরির হুইসেল। তবু নদীর বাতাসে যেন এখনো ভেসে আসে পুরোনো দিনের শব্দ: এক পাড়ে ট্রেন থেমেছে। সামনে যমুনা। আর নদীর বুক চিরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে রেলফেরি। সেই দৃশ্য আজ ইতিহাস।

আর সেই ইতিহাসই জামালপুরের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের এক অমূল্য স্মারক।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies