শওকত জামান ।। স্মৃতির পাতায় পুনাই পার্ক, শহীদ মিনার ও বৈশাখী মেলার মাঠ। একসময় জায়গাগুলো ছিল জামালপুর শহরের প্রাণ। বিকেল নামলেই মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠত পুনাই পার্ক। শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জমত সাংস্কৃতিক আয়োজন। বৈশাখ এলেই মেলার মাঠে বসত প্রাণের বৈশাখী মেলা ও অষ্টমী মেলা। শিশু-কিশোরের উচ্ছ্বাস, তরুণদের আড্ডা, সাংস্কৃতিক কর্মীদের পদচারণা আর সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এসব স্থান হয়ে উঠেছিল শহরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আজ সেসব অনেকটাই স্মৃতির পাতায়। ঐতিহাসিক এসব স্থানের চেনা রূপ বদলে গেছে। সেখানে গড়ে উঠেছে কংক্রিটের সাংস্কৃতিক পল্লীর অবকাঠামো। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ। ফলে যে স্থাপনা শহরের সাংস্কৃতিক বিকাশের কেন্দ্র হওয়ার কথা ছিল, সেটিই এখন অনেকটা পরিত্যক্ত ও বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে শহরবাসীর জন্য।
একসময় পুনাই পার্ক ছিল জামালপুরবাসীর বিনোদন ও অবসর কাটানোর অন্যতম স্থান। শহরের ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবার নিয়ে কিছুটা সময় কাটাতে মানুষ এখানে আসতেন। শিশুদের খেলাধুলা, তরুণদের আড্ডা কিংবা বয়স্কদের বিকেলের হাঁটাহাঁটি, সবকিছুরই একটি আপন ঠিকানা ছিল এই পার্ক।
শহীদ মিনার প্রাঙ্গণের সঙ্গে যুক্ত ছিল অন্যরকম আবেগ। ভাষাশহীদদের স্মরণ, জাতীয় দিবসের কর্মসূচি, কবিতা আবৃত্তি, নাটক, সংগীত ও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন ঘিরে জায়গাটি হয়ে উঠেছিল সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম কেন্দ্র। এটি শুধু একটি স্থাপনা ছিল না; ছিল শহরের মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ।
আর বৈশাখী মেলার মাঠ, সেটি ছিল উৎসবের আরেক নাম। বাংলা নববর্ষ এলেই সেখানে তৈরি হতো অন্যরকম আবহ। নানা পণ্যের দোকান, হস্তশিল্প, খাবারের আয়োজন, নাগরদোলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখর হয়ে উঠত পুরো এলাকা। মেলা ছিল শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনের উপলক্ষ।
সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র বদলে গেছে। উন্নয়ন প্রয়োজন, এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। কিন্তু উন্নয়নের নামে যদি একটি শহরের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও জনসম্পৃক্ততার জায়গাগুলো হারিয়ে যায়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, কী পেলাম, আর কী হারালাম?
কংক্রিটের সাংস্কৃতিক পল্লীর ধারণা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ হতে পারে। তবে সেটি এই ঐতিহাসিক স্থানে না হয়ে অন্য কোনো স্থানে হতে পারত। বছরের পর বছর কাজ বন্ধ থাকলে সেই উদ্যোগই মানুষের কাছে হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অর্ধসমাপ্ত অবকাঠামো শুধু অর্থের অপচয়ের চিহ্ন নয়; এটি পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতারও প্রতিচ্ছবি।
একটি শহরের উন্নয়ন শুধু নতুন ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। শহরের ইতিহাসকে ধারণ করা, পুরোনো সাংস্কৃতিক পরিসরগুলোকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মের জন্য উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করাও উন্নয়নের অংশ।
জামালপুরের মানুষ তাই জানতে চায়, পুনাই পার্কের স্মৃতি কি পুরোপুরি হারিয়ে যাবে? শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ কি কেবল আনুষ্ঠানিকতার জায়গা হয়ে থাকবে? বৈশাখী মেলার সেই প্রাণচাঞ্চল্য কি আর ফিরবে না? আর দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা সাংস্কৃতিক পল্লীর কাজই বা কবে শেষ হবে?
শহরবাসীর কাঁধে উন্নয়নের নামে আরেকটি অচল অবকাঠামোর বোঝা চাপিয়ে দেওয়া নয়, তারা চায় জীবন্ত একটি সাংস্কৃতিক পরিসর।
যেখানে কংক্রিট থাকবে, কিন্তু কংক্রিটের নিচে চাপা পড়বে না স্মৃতি। থাকবে আধুনিক অবকাঠামো, কিন্তু হারিয়ে যাবে না পুনাই পার্কের বিকেল, শহীদ মিনারের আবেগ কিংবা বৈশাখী মেলার আনন্দ।




