পাকিস্তানি টেলিভিশন নাটকের জনপ্রিয়তার নতুন এক নজির তৈরি করেছে ‘দার ই নিজাত’ (Dar-e-Nijaat)। প্রেম, বিচ্ছেদ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, পারিবারিক সম্পর্ক ও ক্ষমার গল্প নিয়ে নির্মিত নাটকটি প্রচারের অল্প সময়ের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মাত্র ২৩টি পর্ব প্রচারের পর নাটকটির বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোট ভিউ ১৭০ কোটি ছাড়িয়েছে বলে দাবি করেছে সম্প্রচারক প্রতিষ্ঠান এআরওয়াই ডিজিটাল। পাকিস্তানের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের দর্শকদের মধ্যেও নাটকটি নিয়ে তৈরি হয়েছে আগ্রহ।
নাটকটির জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে কয়েকটি বিষয়। উমেরা আহমেদের চিত্রনাট্য, জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভিনয়, আবেগঘন গল্প এবং সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে সামাজিক বিতর্ক সব মিলিয়ে এটি এখন পাকিস্তানের আলোচিত টেলিভিশন প্রযোজনাগুলোর একটি। বিশেষ করে আবু বকর ও জারিয়াবের সম্পর্ক নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাটকটির আলোচনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কী আছে নাটকের গল্পে?
‘দার ই নিজাত’ একটি উর্দু রোমান্টিক ও পারিবারিক ধারার নাটক। ২০২৬ সালের ১ আগস্ট পাকিস্তানের এআরওয়াই ডিজিটাল চ্যানেলে এর প্রচার শুরু হয়। নাটকটির নামের অর্থ মুক্তির ঘর বা পরিত্রাণের আশ্রয়। এর চিত্রনাট্য লিখেছেন উমেরা আহমেদ এবং পরিচালনা করেছেন সাকিব খান। প্রযোজনা করেছে থ্রিজ এন্টারটেইনমেন্ট।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র জারিয়াব, জামিলও আবু বকর। জারিয়াবের চরিত্রে অভিনয় করেছেন দুর-ই-ফিশান সেলিম। তাঁর দীর্ঘদিনের প্রেমিক জামিলের চরিত্রে নামির নওয়াজ খান এবং আবু বকরের চরিত্রে অভিনয় করেছেন শেহেরিয়ার মুনাওয়ার।
জারিয়াব ও জামিলের সম্পর্কের শুরু শৈশবের বন্ধুত্ব থেকে। সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে জারিয়াব নিজের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন, এমনকি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগও বিসর্জন দেওয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু জামিলের সিদ্ধান্ত ও আচরণ তাঁদের সম্পর্ককে ভেঙে দেয়। একপর্যায়ে জামিল অন্য একজনকে বিয়ে করেন। এরপর জারিয়াবের জীবনে আবির্ভাব ঘটে আবু বকরের।
আবু বকর একজন ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন, সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল মানুষ। তাঁর মা খুশবখতের সঙ্গে সম্পর্ক, জারিয়াবের প্রতি ভালোবাসা এবং নিজের বিশ্বাস ও আবেগের মধ্যকার দ্বন্দ্ব গল্পটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
আবু বকর কেন দর্শকদের আলোচনার কেন্দ্রে?
নাটকটির জনপ্রিয়তার অন্যতম বড় কারণ আবু বকর চরিত্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক দর্শক তাঁকে আদর্শ জীবনসঙ্গীর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন। তাঁর ধৈর্য, সহানুভূতি, ক্ষমাশীলতা, নারীর প্রতি সম্মান এবং অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে।
এমনকি চরিত্রটি নিয়ে বাস্তব জীবনের তুলনাও শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের অনলাইন সংবাদমাধ্যমেও আবু বকরকে নিয়ে দর্শকদের আগ্রহের খবর প্রকাশিত হয়েছে। ১ নভেম্বর জাগো নিউজের ইংরেজি সংস্করণে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অনেক দর্শক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবু বকরকে নিয়ে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। কেউ তাঁকে আদর্শ স্বামী হিসেবে দেখছেন, কেউ তাঁর ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করছেন। English+1
তবে চরিত্রটির জনপ্রিয়তার একটি মজার দিক সামনে এনেছেন স্বয়ং অভিনেতা শেহেরিয়ার মুনাওয়ার।
২৯ অক্টোবর বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্কে সাংবাদিক হারুন রশিদের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, আবু বকরকে যতটা নিখুঁত মনে হয়, বাস্তবে চরিত্রটি ততটা নিখুঁত নয়। তাঁর মধ্যে রয়েছে ‘পিপল প্লিজার’ বা অন্যকে খুশি করার প্রবণতা এবং ‘সেভিয়ার কমপ্লেক্স’ বা অন্যকে উদ্ধার করার অতিরিক্ত মানসিক চাপ।
অভিনেতার ভাষ্য অনুযায়ী, আবু বকর সহজে কাউকে না বলতে পারেন না। তাঁর মা খুশবখতের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা ও প্রত্যাশা তাঁকে সব সময় অন্যের জন্য কিছু করার চাপের মধ্যে রাখে।
সাক্ষাৎকারে আরও একটি মজার তথ্য জানান শেহেরিয়ার। তাঁর ব্যাখ্যায়, আবু বকর গল্পের শুরু থেকেই জারিয়াবকে ভালোবাসতেন। কিন্তু সেই অনুভূতি প্রকাশ করতেন না। এমনকি একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে জারিয়াবের পছন্দের পাস্তার কথা মনে রাখার ঘটনাটিও ছিল সেই গোপন ভালোবাসার ইঙ্গিত।
জামিলের চরিত্র ঘিরে সামাজিক বিতর্ক
নাটকটির জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় কারণ জামিলের চরিত্র। বিশেষ করে ধর্মীয় অনুশাসন গ্রহণের পর তাঁর আচরণ দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করে।
ডনের বিনোদনবিষয়ক সাময়িকী ‘ইমেজেস’-এর ১৪ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, নাটকের ১৩তম পর্বে জামিল জারিয়াবকে জানান, তিনি তাঁকে বিয়ে করতে চান না। কারণ, তাঁর দৃষ্টিতে জারিয়াব একজন ধর্মপরায়ণ মুসলিমের স্ত্রী হওয়ার উপযুক্ত নন। অথচ এর আগে দীর্ঘদিন তাঁদের সম্পর্ক ছিল।
জামিল নিজের অতীতকে অজ্ঞতার সময় হিসেবে বর্ণনা করে নতুন জীবন শুরু করার যুক্তি দেন। তাঁর এই দ্বৈত আচরণ দর্শকদের একাংশকে ক্ষুব্ধ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে, একজন পুরুষ নিজের অতীত ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে নতুন জীবন শুরু করতে পারলে একজন নারীর জন্য একই সুযোগ কেন থাকবে না?
জারিয়াবের চরিত্রের মধ্য দিয়ে নারী-পুরুষের জন্য সমাজে প্রচলিত ভিন্ন নৈতিক মানদণ্ডের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। Images
উমেরা আহমেদের লেখায় সম্পর্ক, ধর্ম ও আত্মসমালোচনা
পাকিস্তানের জনপ্রিয় লেখক ও চিত্রনাট্যকার উমেরা আহমেদের নামের সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় নতুন নয়। ‘জিন্দেগি গুলজার হ্যায়’, ‘আলিফ’ এবং ‘সিনফ-এ-আহান’-এর মতো আলোচিত কাজের মধ্য দিয়ে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার উর্দুভাষী দর্শকদের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন।
তাঁর লেখার একটি বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিগত সম্পর্কের গল্পের সঙ্গে সামাজিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস, আত্মপরিচয় ও নৈতিকতার প্রশ্ন যুক্ত করা। ‘দার ই নিজাত’-এও সেই প্রবণতা দেখা যায়।
আবু বকর চরিত্রকে দর্শকদের একাংশ যখন অবাস্তব বা অতিরিক্ত ভালো মানুষ হিসেবে বিবেচনা করছেন, তখন উমেরা আহমেদ পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন, সহানুভূতি, ক্ষমাশীলতা, উদারতা ও অন্যের ভুল উপেক্ষা করার মতো সাধারণ মানবিক গুণাবলি এখন এত বিরল হয়ে উঠেছে কেন যে পর্দায় দেখলে সেগুলোকে অবিশ্বাস্য মনে হয়?
এই বক্তব্য নাটকটির দর্শকপ্রতিক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
আবু বকরের মা খুশবখত, প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনাও
নাটকে খুশবখত চরিত্রে অভিনয় করেছেন পাকিস্তানের বর্ষীয়ান অভিনেত্রী সানিয়া সাঈদ। আবু বকরের সঙ্গে তাঁর মা-ছেলের সম্পর্ক দর্শকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অনেকেই আবু বকরের মতো অনুগত ও দায়িত্বশীল সন্তান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু এই সম্পর্কের উপস্থাপন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন স্বয়ং সানিয়া সাঈদ।
বিবিসি উর্দুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সমাজে মা-বাবার কথা বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া সন্তানকে আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা রয়েছে। তাঁর মতে, খুশবখত যেভাবে আবু বকরকে বড় করেছেন, সেটি প্রচলিত বাস্তবতার তুলনায় কিছুটা অস্বাভাবিক।
তিনি আরও মনে করেন, মানসিক আঘাত বা সম্পর্কের ক্ষতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একজন মানুষের সময় প্রয়োজন। একটি সম্পর্কের ট্রমা কাটিয়ে ওঠার আগেই আরেকটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া কিংবা বিয়েকে সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখা মনস্তাত্ত্বিকভাবে যথাযথ নয়।
সানিয়া সাঈদের এই বক্তব্য নাটকটির গল্পের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
পর্দার বাইরেও জনপ্রিয়তার বিস্তার
নাটকটির দর্শকপ্রিয়তা শুধু পাকিস্তানের টেলিভিশন দর্শকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের দর্শকদের মধ্যেও এর আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাটকের দৃশ্য, সংলাপ, চরিত্র বিশ্লেষণ এবং সম্পাদিত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে নাটকের আবহসংগীত নিয়ে। ভারতীয় টেলিভিশন অভিনেতা নকুল মেহতা নাটকটির অরিজিনাল সাউন্ডট্র্যাকের প্রশংসা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এর সুরের প্রশংসা করে জানতে চান, এত সুন্দর সাউন্ডট্র্যাক কোথায় পাওয়া যাবে। ভারতীয় একজন জনপ্রিয় অভিনেতার এমন প্রশংসাও নাটকটির আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
নাটকটি প্রতি শুক্রবার ও শনিবার পাকিস্তান সময় রাত ৮টায় এআরওয়াই ডিজিটালে প্রচারিত হয়। অনলাইন দর্শকদের জন্য ইউটিউব ও এআরওয়াই প্লাসেও পর্বগুলো প্রকাশ করা হচ্ছে।
একটি নাটকের জনপ্রিয়তার চেয়েও বেশি কিছু
‘দার ই নিজাত’-এর জনপ্রিয়তাকে শুধু প্রেমের গল্প কিংবা কয়েকজন জনপ্রিয় অভিনেতার অভিনয়ের সাফল্য হিসেবে দেখলে এর ব্যাপ্তি বোঝা কঠিন। নাটকটি দর্শকদের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন হাজির করেছে, যেগুলো দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।
একজন ভালো মানুষ কেমন হবেন? ধর্মীয় অনুশাসন কি মানুষের মধ্যে বিনয় ও সহানুভূতি বাড়াবে, নাকি কখনো কখনো অন্যকে বিচার করার হাতিয়ার হয়ে উঠবে? ভালোবাসার জন্য আত্মত্যাগের সীমা কোথায়? একজন নারীর জীবনের লক্ষ্য কি শেষ পর্যন্ত বিয়ে ও সংসারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
এসব প্রশ্নের সব উত্তর নাটকটি দিতে পেরেছে, এমন দাবি করা যায় না। বরং এর কিছু গল্পের বাঁক নিয়েই দর্শকদের আপত্তি রয়েছে। কিন্তু সেই মতবিরোধই নাটকটিকে আলোচনায় রেখেছে।
২৩ পর্বে ১৭০ কোটির বেশি ভিউয়ের যে দাবি সম্প্রচারক প্রতিষ্ঠান করেছে, সেটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা দর্শকসংখ্যা নয়; এটি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জমা হওয়া মোট ভিউয়ের হিসাব বলে জানানো হয়েছে। তাই সংখ্যাটিকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ‘দার ই নিজাত’ এখন আর কেবল পাকিস্তানের একটি টেলিভিশন নাটক নয়। এটি প্রেম, ধর্ম, নৈতিকতা, পারিবারিক সম্পর্ক ও নারী-পুরুষের সামাজিক অবস্থান নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দর্শকদের মধ্যে চলমান আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
